১৯২৪ সালের জুন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এক তরুণ অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু বার্লিনে আলবার্ট আইনস্টাইনকে একটি স্বহস্তে লিখিত গবেষণাপত্র পাঠান। বসু কোনো ক্লাসিক্যাল তড়িচ্চুম্বকীয় তত্ত্ব ব্যবহার না করেই সম্পূর্ণ নতুন ধরনের গণনা পদ্ধতির মাধ্যমে প্লাঙ্কের কৃষ্ণবস্তু বিকিরণ সূত্র প্রতিপাদন করেছিলেন, যেখানে তিনি আলোকে ভরহীন ও সম্পূর্ণ অভেদযোগ্য কণার এক ঝাঁক হিসেবে গণ্য করেন। আইনস্টাইন এই গবেষণার বৈপ্লবিক গুরুত্ব তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারেন। তিনি নিজে এটি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে Zeitschrift für Physik জার্নালে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন এবং বসুর এই পদ্ধতিকে আলোর কণা থেকে ভরযুক্ত পরমাণুর গ্যাসে প্রয়োগ করেন। আর এর ফলেই উন্মোচিত হয় এক অবিশ্বাস্য সত্য: অতি-শীতল তাপমাত্রায় কোটি কোটি পরমাণু তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে একটি একক দানবীয় কোয়ান্টাম তরঙ্গে একীভূত হয়ে যাবে—যার নাম বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবন (Bose-Einstein Condensation)।
কোয়ান্টাম অভেদযোগ্যতা ও বসুর পরিসংখ্যান
চিরায়ত পদার্থবিদ্যায় দুটি অভিন্ন কণাকে তাদের নির্দিষ্ট পথ ধরে আলাদা করা গেলেও কোয়ান্টাম মেকানিক্সে হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতির কারণে একই ধরনের কণাগুলো সম্পূর্ণ অভেদযোগ্য। যেসব কণার স্পিন পূর্ণসংখ্যা ($S = ০, ১, ২, dots$), তাদের বলা হয় বোসন (Bosons)। বোসনের বহু-কণা তরঙ্গ ফাংশন কণা স্থানান্তরের সাপেক্ষে সম্পূর্ণ প্রতিসম:
$$psi(dots, mathbf{r}_j, dots, mathbf{r}_k, dots) = +psi(dots, mathbf{r}_k, dots, mathbf{r}_j, dots)$$
একটি কোয়ান্টাম স্তরে কতগুলো বোসন থাকতে পারবে তার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায়, গ্র্যান্ড পার্টিশন ফাংশন প্রতিটি একক-কণা শক্তিস্তরের গুণফল হিসেবে লেখা যায়:
$$Xi_{text{Bose}} = prod_{k} frac{1}{1 – e^{-beta(epsilon_k – mu)}}$$
এই ধারাটি সসীম হওয়ার জন্য রাসায়নিক বিভবের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত হয়: $mu le 0$। এর ব্যবকলন থেকে পাওয়া যায় বিশ্বখ্যাত বোস-আইনস্টাইন বণ্টন সমীকরণ:
$$bar{n}_k = frac{1}{e^{beta(epsilon_k – mu)} – 1}$$
ঘনীভবন প্রক্রিয়া ও সন্ধি তাপমাত্রা
মোট কণা সংখ্যা $N$ হিসাব করতে আমরা ভূমি স্তরের কণা $N_0$ এবং উত্তেজিত স্তরের কণাকে আলাদা করি। তাপমাত্রা হ্রাস পেতে থাকলে ফুগাসিটি $z = e^{beta mu}$ তার সর্বোচ্চ তাত্ত্বিক সীমা $z to 1$-এ পৌঁছায়। এই সন্ধিমুহূর্তে উত্তেজিত স্তরগুলো পুরোপুরি কণা দ্বারা সম্পৃক্ত হয়ে যায়—তারা আর একটি অতিরিক্ত কণাও ধারণ করতে পারে না!
যে তাপমাত্রায় এই কোয়ান্টাম সম্পৃক্ততা ঘটে, তাকে বলা হয় সন্ধি তাপমাত্রা ($T_c$):
$$T_c = frac{2pi hbar^2}{m k_B} left( frac{N / V}{zeta(3/2)} right)^{2/3}$$
তাপীয় দ্য ব্রয় তরঙ্গদৈর্ঘ্য $lambda_{text{th}} = sqrt{frac{2pi hbar^2}{m k_B T}}$-এর সাহায্যে একে ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়: যখন পরমাণুগুলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য তাদের পারস্পরিক দূরত্বের চেয়ে বড় হয়ে একে অপরকে ঢেকে ফেলে ($n lambda_{text{th}}^3 ge ২.৬১২$), তখনই এই ঘনীভবন শুরু হয়।
ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম কোহেরেন্স
$T_c$-এর নিচে অতিরিক্ত সমস্ত পরমাণু কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এক অদৃশ্য নিয়মে সরাসরি শূন্য ভরবেগের ভূমিস্তরে ($epsilon_0 = 0$) পতিত হয়:
$$frac{N_0(T)}{N} = 1 – left(frac{T}{T_c}right)^{3/2}$$
এই দশা রূপান্তরের পেছনে পরমাণুগুলোর মধ্যকার কোনো বলের প্রয়োজন হয় না—এটি ঘটে কেবল কোয়ান্টাম পরিসংখ্যানের শক্তিতে। ঘনীভূত অবস্থায় কোটি কোটি স্বাধীন পরমাণু একই সাথে একটি একক ম্যাক্রোস্কোপিক তরঙ্গ ফাংশন ধারণ করে, যার ফলে জন্ম নেয় শূন্য সান্দ্রতা, সুপারফ্লুইডিটি এবং কোয়ান্টাম ঘূর্ণাবর্ত।
১৯৯৫ সালে এরিক কর্নেল ও কার্ল ওয়াইম্যান লেজার শীতলীকরণ প্রযুক্তির সাহায্যে রুবিডিয়াম পরমাণুকে মাত্র ১৭০ ন্যানোকেলভিন তাপমাত্রায় নামিয়ে গবেষণাগারে প্রথম বিশুদ্ধ বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবন তৈরি করে ২০০১ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও আইনস্টাইনের সেই স্বপ্নিল ভবিষ্যদ্বাণী মানবজাতির সামনে বাস্তব রূপ লাভ করে।