পানি ফুটে বাষ্পে পরিণত হওয়া, গলিত লোহা ঠান্ডা হয়ে চুম্বকে রূপ নেওয়া, কিংবা সিরামিক অক্সাইড সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক রোধ হারিয়ে অতিপরিবাহী (superconductor)-তে পরিণত হওয়া—পদার্থের এই আকস্মিক ও নাটকীয় রূপান্তরকে বলা হয় দশা রূপান্তর (Phase Transition)। আণুবীক্ষণিক পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি এক পরম গাণিতিক ধাঁধা: পরমাণুর হ্যামিল্টোনিয়ান সম্পূর্ণ মসৃণ ও ব্যবকলনযোগ্য, অথচ দৃশ্যমান জগতে দশা রূপান্তরের মুহূর্তে ভৌত রাশিগুলো হঠাৎ অসীমের দিকে ধাবিত হয় বা আকস্মিক লাফের সৃষ্টি করে। ১৯৩৭ সালে সোভিয়েত তাত্ত্বিক পদার্থবিদ লেভ দাভিদোভিচ ল্যান্ডউ প্রতিসাম্যের জ্যামিতিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে সন্ধি ঘটনা ব্যাখ্যার এক যুগান্তকারী সাধারণ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন: ল্যান্ডউ গড় ক্ষেত্র তত্ত্ব (Landau Mean Field Theory)।
এরেনফেস্টের দশা রূপান্তর শ্রেণিবিন্যাস
চিরায়ত তাপগতিবিদ্যায় পল এরেনফেস্ট মুক্ত শক্তির ব্যবকলনের ভিত্তিতে দশা রূপান্তরকে দুই ভাগে বিভক্ত করেন:
- প্রথম-মাত্রার রূপান্তর: গিবস মুক্ত শক্তির প্রথম মাত্রার ব্যবকলন—এন্ট্রপি $S = -(partial G / partial T)_P$ এবং আয়তন $V = (partial G / partial P)_T$-তে আকস্মিক লাফের সৃষ্টি হয়। ফলে এতে সুপ্ততাপ ($L = T Delta S$) ও ঘনত্বের পরিবর্তন ঘটে। বরফ গলে পানি হওয়া বা পানি ফুটে বাষ্প হওয়া প্রথম মাত্রার রূপান্তর।
- ধারাবাহিক (দ্বিতীয়-মাত্রার) রূপান্তর: প্রথম ব্যবকলনে কোনো লাফ থাকে না (কোনো সুপ্ততাপ নেই, $Delta S = 0$), কিন্তু দ্বিতীয় মাত্রার ব্যবকলন—তাপধারণ ক্ষমতা $C_P = -T(partial^2 G / partial T^2)_P$ বা চৌম্বক গ্রাহিতা $chi$ সন্ধিবিন্দুতে অসীমে পৌঁছায়। লোহার কুরি বিন্দুতে চুম্বকায়ন দ্বিতীয় মাত্রার রূপান্তর।
অর্ডার প্যারামিটার ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিসাম্য ভঙ্গ
ল্যান্ডউ উপলব্ধি করেন যে ধারাবাহিক দশা রূপান্তর কেবল তাপগতীয় ব্যবকলন নয়; এটি ব্যবস্থার মৌলিক প্রতিসাম্যের (Symmetry) রূপান্তরকে নির্দেশ করে। সন্ধি তাপমাত্রা $T_c$-এর উপরে একটি চুম্বক সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল: অণুগুলোর স্পিন সবদিকে এলোমেলোভাবে থাকায় ব্যবস্থাটি স্থানিক ঘূর্ণন প্রতিসাম্য বজায় রাখে। কিন্তু $T_c$-এর নিচে স্পিনগুলো হঠাৎ একটি নির্দিষ্ট দিকে সারিবদ্ধ হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই ঘূর্ণন প্রতিসাম্য ভেঙে ফেলে।
এই প্রতিসাম্য ভঙ্গের মাত্রা পরিমাপ করতে ল্যান্ডউ প্রবর্তন করেন অর্ডার প্যারামিটার ($m$): যা উচ্চ তাপমাত্রায় নিখুঁত শূন্য থাকে এবং নিম্ন তাপমাত্রায় অশূন্য মান ধারণ করে:
$$m = begin{cases} 0 & T > T_c \ pm m_0(T) ne 0 & T < T_c end{cases}$$
ল্যান্ডউ মুক্ত শক্তি সম্প্রসারণ
সন্ধিবিন্দুর কাছাকাছি অর্ডার প্যারামিটারের মান খুব ক্ষুদ্র ($m ll 1$)। বাহ্যিক ক্ষেত্র না থাকলে স্থানিক উল্টানোর প্রতিসাম্যের কারণে ($m to -m$) মুক্ত শক্তিতে $m$-এর বিজোড় ঘাতগুলো শূন্য হয়ে যায়:
$$f(m, T) = f_0(T) + frac{a(T)}{2} m^2 + frac{b}{4} m^4 – h m$$
ব্যবস্থার স্থায়িত্বের জন্য $b > 0$ হতে হয়, এবং দ্বিঘাত সহগ $a(T)$ সন্ধিবিন্দু পার হওয়ার সময় চিহ্ন পরিবর্তন করে: $a(T) = a_0(T – T_c)$। এই বিভব অপেক্ষকটির জ্যামিতিক রূপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
- $T > T_c$ ($a > 0$): অপেক্ষকটি একটি একক উত্তল প্যারাবোলা, যার সর্বনিম্ন বিন্দু $m^* = 0$। ফলে বিশৃঙ্খল প্রতিসম দশা স্থায়ী হয়।
- $T < T_c$ ($a < 0$): $m = 0$ বিন্দুটি একটি অস্থির চূড়ায় পরিণত হয় এবং দুই পাশে দুটি নতুন গভীর উপত্যকা তৈরি হয় (ডাবল-ওয়েল বা মেক্সিকান হ্যাট বিভব):
$$m_0(T) = pm sqrt{frac{a_0}{b}} (T_c – T)^{1/2}$$
ব্যবস্থাটিকে যেকোনো একটি উপত্যকা বেছে নিতে হয়, যার মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে $pm m$ প্রতিসাম্য ভেঙে পড়ে!
সর্বজনীন ক্রিটিক্যাল সূচক (Critical Exponents)
ল্যান্ডউ তত্ত্ব প্রমাণ করে যে সন্ধিবিন্দুর কাছাকাছি বিভিন্ন ভৌত রাশি সর্বজনীন ঘাত নিয়ম মেনে চলে:
- অর্ডার প্যারামিটার সূচক ($beta$): $m_0 propto (T_c – T)^{1/2} implies beta = 1/2$।
- গ্রাহিতা সূচক ($gamma$): $chi = (partial m / partial h) propto |T – T_c|^{-1} implies gamma = 1$।
- তাপধারণ ক্ষমতার ব্যবধান ($alpha$): সন্ধিবিন্দুতে আপেক্ষিক তাপে একটি নির্দিষ্ট লাফ দেখা যায়: $alpha = 0$।
গিনজবার্গ মানদণ্ড ও তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা
ল্যান্ডউ তত্ত্ব ধরে নিয়েছিল যে অর্ডার প্যারামিটার সর্বত্র স্থানিকভাবে সমসত্ত্ব—অর্থাৎ এটি স্থানীয় পরিসংখ্যানিক ওঠানামাকে উপেক্ষা করেছিল। ভিতালি গিনজবার্গ প্রমাণ করেন যে স্থানীয় ওঠানামা তখনই অগ্রাহ্য করা যায় যখন স্থানিক মাত্রা চার বা তার বেশি হয় ($d > 4$)। আমাদের বাস্তব ৩-মাত্রিক জগতে সন্ধিবিন্দুতে স্থানীয় ওঠানামা এত প্রবল হয় যে ল্যান্ডউয়ের সরল সূচকগুলো ($beta = 1/2$) ভুল প্রমাণিত হয়। ত্রিমাত্রিক জগতের এই গভীর সত্য উন্মোচন করতে পরবর্তীতে আবিষ্কৃত হয় রিনরমালাইজেশন গ্রুপ তত্ত্ব।