নিউটনের গতিসূত্রের একটি অসাধারণ গাণিতিক প্রতিসাম্য রয়েছে: তারা সময়ের বিপরীতে সম্পূর্ণ অপরিবর্তনশীল ($t to -t$)। দুটি বিলিয়ার্ড বলের স্থিতিস্থাপক সংঘর্ষের ভিডিও ধারণ করে উল্টো চালালে মেকানিক্সের কোনো সূত্রই ভঙ্গ হয় না। তবে বাস্তব ম্যাক্রোস্কোপিক জগতে হাত থেকে ফেলে দেওয়া সিরামিকের কফি মগ ভেঙে মেঝেতে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যায়, কিন্তু মেঝের ভাঙা টুকরোগুলো কখনোই নিজে থেকে জোড়া লেগে লাফিয়ে আবার আপনার হাতে ফিরে আসে না কেন? একটি ভাজা ডিমকে কেন কখনো আগের কাঁচা অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না? ১৮৭২ সালে লুডভিগ বোল্টজম্যান মেকানিক্সের মাধ্যমে এন্ট্রপির বৃদ্ধির প্রমাণ দিতে প্রতিষ্ঠা করেন এইচ-থিওরেম (H-Theorem)। আর এর মাধ্যমেই বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম গভীর দার্শনিক বিতর্কের সূচনা হয়: সময়ের তিরের উৎস (The Arrow of Time)।

বোল্টজম্যান ট্রান্সপোর্ট সমীকরণ ও এইচ-ফাংশনাল

একটি সাম্যাবস্থাহীন গ্যাসের কালানুক্রমিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে বোল্টজম্যান একক-কণা বণ্টন অপেক্ষক $f(mathbf{r}, mathbf{v}, t)$ প্রবর্তন করেন। সংঘর্ষহীন অবস্থায় লিওভিল উপপাদ্য অনুযায়ী $df/dt = 0$। কিন্তু কণাগুলোর মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সংঘর্ষ বিবেচনা করে বোল্টজম্যান তৈরি করেন তার যুগান্তকারী সমীকরণ:

$$frac{partial f}{partial t} + mathbf{v} cdot nabla_{mathbf{r}} f + frac{mathbf{F}}{m} cdot nabla_{mathbf{v}} f = left( frac{partial f}{partial t} right)_{text{coll}}$$

সংঘর্ষ সমাকলন হিসাব করতে গিয়ে বোল্টজম্যান একটি বৈপ্লবিক অনুমান করেন—আণবিক বিশৃঙ্খলা অনুমান (Stosszahlansatz): তিনি ধরে নেন যে দুটি কণা সংঘর্ষের ঠিক পূর্বমুহূর্তে পরিসংখ্যানগতভাবে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও অসংলগ্ন থাকে: $f_2(mathbf{v}_1, mathbf{v}_2) = f(mathbf{v}_1) f(mathbf{v}_2)$। এই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তিনি $H(t)$ ফাংশনাল সংজ্ঞায়িত করেন:

$$H(t) = int f(mathbf{v}, t) ln f(mathbf{v}, t) , d^3v$$

যেহেতু $f ln f$ হলো ঋণাত্মক এন্ট্রপি ঘনত্ব, তাই $H(t)$ সরাসরি তাপগতিবিদ্যার ঋণাত্মক এন্ট্রপির সমানুপাতিক: $S(t) = -k_B H(t)$। সময়ের সাপেক্ষে ব্যবকলন করে সংঘর্ষের সূত্র বসালে বোল্টজম্যান প্রমাণ করেন তার ঐতিহাসিক এইচ-থিওরেম:

$$frac{dH}{dt} le 0 iff frac{dS}{dt} ge 0$$

বোল্টজম্যান বিশ্বাস করেছিলেন যে তিনি নিউটনের প্রত্যাবর্তী মেকানিক্স থেকে তাপগতিবিদ্যার অপ্রত্যাবর্তী দ্বিতীয় সূত্রকে সম্পূর্ণ যান্ত্রিকভাবে প্রতিপাদন করে ফেলেছেন।

লশমিটের প্যারাডক্স ও প্রতিসাম্য বিতর্ক

বোল্টজম্যানের ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী জোসেফ লশমিট এতে এক বিরাট যৌক্তিক অসঙ্গতি (Umkehreinwand) ধরিয়ে দেন:

যদি কণাগুলোর গতিবিদ্যা সম্পূর্ণ প্রত্যাবর্তী নিউটোনীয় সূত্র মেনে চলে, তবে এমন যেকোনো গতিপথ যার ফলে $H$ হ্রাস পায় (অর্থাৎ এন্ট্রপি বাড়ে), তার প্রতিটি কণার ভরবেগকে যদি তাৎক্ষণিকভাবে উল্টে দেওয়া হয় ($mathbf{p}_i to -mathbf{p}_i$), তবে যান্ত্রিক সূত্র অনুযায়ী কণাগুলো হুবহু আগের পথ বেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য এবং সেখানে $H$ বৃদ্ধি পাবে! সুতরাং কোনো যান্ত্রিক নিয়ম কখনো $dH/dt le 0$ বাধ্যতামূলক করতে পারে না।

লশমিটের এই আপত্তি পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তিমূলে আঘাত করেছিল: সম্পূর্ণ কাল-প্রতিসম মেকানিক্স থেকে সময়ের একমুখী অসমতা কীভাবে তৈরি হতে পারে?

আণবিক বিশৃঙ্খলা ও পরিসংখ্যানিক সমাধান

বোল্টজম্যান উপলব্ধি করেন যে সময়ের অসমতা মূলত তার আণবিক বিশৃঙ্খলা অনুমানের ভেতর লুকিয়ে ছিল। সংঘর্ষের পূর্বে কণা দুটিকে স্বাধীন ধরে নেওয়ার মাধ্যমেই তিনি সমীকরণে একটি সময়ের দিক ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। বাস্তবে সংঘর্ষের পর কণা দুটির মধ্যে গভীর কোরিলেশন সৃষ্টি হয়। যদি আপনি সমস্ত ভরবেগ উল্টে দেন, তবে সেই কণাগুলো অতিসূক্ষ্ম কোরিলেশন ধারণ করে আগের পথে ফিরবে—যা বিশৃঙ্খলা অনুমানকে সরাসরি লঙ্ঘন করে। এমন মাইক্রোস্টেট তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও ফেজ স্পেসে তাদের আয়তন অত্যন্ত নগণ্য।

এন্ট্রপির বৃদ্ধি কোনো পরম যান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা নয়; এটি হলো এক অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যানিক স্বাভাবিকতা (Statistical Typicality)। ফেজ স্পেসের মোট আয়তনের ৯৯.৯৯৯৯…% অংশ দখল করে থাকে সর্বোচ্চ এন্ট্রপির সাম্যাবস্থা। যেকোনো বিশৃঙ্খল ব্যবস্থার সাম্যাবস্থায় যাওয়ার সম্ভাবনা এত বেশি কেবল এই কারণে যে সুশৃঙ্খল থাকার চেয়ে বিশৃঙ্খল হওয়ার উপায় কোটি কোটি গুণ বেশি।

অতীত স্বতঃসিদ্ধ (The Past Hypothesis) ও মহাজাগতিক রহস্য

এই পরিসংখ্যানিক সমাধান বিজ্ঞানে এক আরও গভীর মহাজাগতিক প্রশ্নের জন্ম দিল: যদি সর্বোচ্চ এন্ট্রপিই সবচেয়ে স্বাভাবিক হয়, তবে আজ আমাদের মহাবিশ্ব সাম্যাবস্থায় পৌঁছে সম্পূর্ণ মৃত হয়ে নেই কেন? কেন আজও নক্ষত্র জ্বলে, সূর্য আলো দেয় এবং জীবনের অস্তিত্ব টিকে আছে?

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান ও রজার পেনরোজ দেখিয়েছেন, তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র আজ কাজ করছে কেবল এই কারণে যে ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পূর্বে মহাবিস্ফোরণের প্রারম্ভে আমাদের মহাবিশ্ব এক অবিশ্বাস্য রকমের নিম্ন এন্ট্রপিতে শুরু হয়েছিল (The Past Hypothesis)। আদি মহাবিশ্বে মহাকর্ষীয়ভাবে পদার্থ এত মসৃণ ও সমভাবে বণ্টিত ছিল যে তা এক সুবিশাল ঋণাত্মক এন্ট্রপির ভাণ্ডার তৈরি করেছিল। আজ পৃথিবীতে এন্ট্রপির প্রতিটি বৃদ্ধি—কয়লা পোড়ানো থেকে শুরু করে আমাদের মস্তিষ্কের নিউরনের স্পন্দন—সেই আদিম মহাজাগতিক ঘড়ির অবিরাম ধীরগতির নিঃসরণ মাত্র।